Sunday, August 1, 2010

“নাটুকের” সেকাল-একাল

স্বভাবে নাটুকে হলেও আমি সেই অর্থে খুব বেশিদিন আগে নাটক দেখা শুরু করিনি। অবশ্য বাবা-মা ছোটবেলায় একবার একটি নাটক দেখাতে নিয়ে গেছিলেনঃ উত্তম মঞ্চে। বিখ্যাত সেই নাটকের নাম ছিল ‘নহবত’।


তরুন কুমার অভিনীত সেই নাটকের স্মৃতি আজ এই এত বছর পরে আমার খুব বেশি নেই (কি করে থাকবে… প্রেমিকাদের নাম-ই ঠিকঠাক খেয়াল থাকে না), তবে মনে আছে সেই নাটকের এক চরিত্র কিভাবে যেন আমার ছোট মাসীকেও ‘part of the act’ করে তার নহবত দেখার স্মৃতিটিকে উল্লেখযোগ্য করে তুলেছিলেন।


যখন ক্রমে বড় হই এবং নাটকের বিষয়ে মনে কৌতুহল জন্মাতে শুরু করে, তখন আমার প্রথম উপলব্ধিই হয় অনুশোচনার। উৎপল দত্তের অভিনয় ছায়াছবিতে দেখে আন্দাজ করতে পারি তিনি কতটা দাপটের সাথে স্টেজ কাঁপিয়ে বেড়াতেন, এবং অনেকের মুখে বিজন চক্রবর্তী, শম্ভু মিত্রদের কথা শুনেও মনে হতে থাকেঃ ‘নাঃ জন্ম নিতেবড্ড দেরি হয়ে গেল দেখছি!’ সিনেমা স্টার-দের বিষয় যে ব্যাপারটি হয় না (DVD, TV-র দৌলতে), সেই জিনিসটিই এই বিখ্যাত, অথচ আপাত-অপরিচিত নাট্যাভিনেতাদের ক্ষেত্রে একটা Mysticism তৈরি করে।


তবে উৎপল বাবুর প্রায় সমগোত্রিয় যে লেখক/অভিনেতা বাংলা স্টেজে একের পর এক Masterpiece রচনা করে গেছেন, সেই মনোজ মিত্রের একটি নাটক (যা নেই ভারতে) দেখার সুযোগ ঘটে যায় গত শুক্রবার। মনোজবাবুর অসাধারণ অভিনয়-দক্ষতা নিয়ে একটা ধারণা ছিল বাঞ্ছারামের বাগান থেকে (যেটি তারই লেখা নাটক ‘সাজানো বাগান’ থেকে তপনবাবু “ফিল্মায়ণ” করেন)। তবে সামনাসামনি স্টেজে এই কিংবদন্তী-কে দেখা সত্যি এক ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা।


আরো একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয় তার পরের দিন, শনিবার ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’ দেখতে গিয়ে। দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনির ওপর লেখা এই নাটক-টি একালের সবচেয়ে বিখ্যাত নাটক-গুলির অন্যতম। তাই তো তাদের ৫৪ তম পারফরমেন্সেও একাডেমির বাইরে থাকা পোস্টারের গায়ে একদিন আগেই ‘প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ’ তকমা পড়ে যায়। এই সুলিখিত (এবং ব্রাত্যবাবুর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়ঃ controversial) নাটকের মূল আকর্ষণ নিঃসন্দেহে দেবব্রতবাবুর ভূমিকায় দেবশঙ্কর হালদার। অল্প কথায় বলা যায়, তার মতন বিশ্বাসযোগ্য (বা বলা ভাল, ‘নিঁখুত’) অভিনয় স্টেজে তো বটেই, হাজার টেকে ক্যানবন্দি হওয়া রুপোলি পর্দায়ও খুব বেশি দেখবার সুযোগ পাইনি।


বাংলা থিয়েটার নিয়ে এখনো বহু লোকের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে এই শিল্প-টি ‘পড়তির দিকে’। লোকজন ভিড় করে না, তারা আর নাটকে ইন্টারেস্টেড নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কথাটা কিছু অংশে সত্যি, সেটি অস্বীকার করবার জো নেই, তবে এই “মৃত”শিল্পে যদি আরও কয়েকটি দেবশঙ্কর হালদার চলে আসেন, এবং হাইপ-তৈরি করবার মতন কিছু লেখক, তাহলে নিঃসন্দেহে এই ‘superior’ শিল্প আবার কলকাতার একটি প্রধান বিনোদনে পরিনত হবে। উৎপল দত্ত, মনোজ মিত্রদের পরেও তাদের symbolic baton-টি বোধহয় ঠীক লোকেরাই এগিয়ে নিয়ে চলেছে। টাকার অন্তহীন খোঁজে (পড়ুনঃ তারার ‘অন্তহীন’ খোঁজে) নির্লজ্জ product placement ছাড়াও যে সত্যিকারের ‘শিল্প’ তৈরি করে বেঁচে থাকা যায়, সেটি কলকাতার যে কোন নাট্যগৃহে আড়াই ঘন্টা কাটালেই যে কোন কলকাতাবাসী বুঝতে পারবে।

No comments: