Friday, September 24, 2010

ছোটগল্প

এক অসফল পরিচালকের আত্মকথা

জগন্নাথ চক্রবর্ত্তী

সত্যি বলতে কি, মাঝেমধ্যে প্রচন্ড রাগ হয়। মনে হয় সব শালা ফালতু; তা সে আমার ঘরের দেওয়ালে টানানো মহান পরিচালক হোন, বা কিছুক্ষণ আগে 'অলি পাব'-এ বসে যার সাথে হেসে হেসে আড্ডা মেরে আসলাম, সেই লোকটালোকটা ফ্রি-তে মাল খাওয়াতে চাইল, আর আমিও চুপচাপ বসে গেলাম। গ্যাঁজাল শালা দেড় ঘন্টা ধরে। মাল-টা সিনেমা করবে, অগ্নিপ্রেমকোন শালা একটা না-খেতে পাওয়া বা বেশি-খেতে চাওয়া ডিরেক্টর-কে নাকি যোগাড় করেছেঃ সে বানাবে বই, অথচ বই-এর প্রথমে ড্যাব-ড্যাবে লাল গ্রাফিক্সে নাম যাবে নাকি এই শালার। ভাল কথা, আমার কি? নিজের পয়সা নিজে ওড়াচ্ছে, নিজের নাম পর্দায় দেখার জন্যে আর্ট আর এথিক্সের ১০৮ দিয়ে একা একা হলে বসে সিনেমা দেখবে। আর ওই সিনেমা যদি হিট করে যায়, তাহলে তো কথাই নেই- পেট ফুলে আরো বড়লোক হয়ে চারটে মেয়ে নিয়ে ব্যাংকক, বা অন্তত বকখালি যাবে লোকেশন দেখতেলোকেশন দেখবে না অন্য কিছু, তা ভালরকম জানা আছে!

ওদিকে আমায় দেখুনঃ আমি শালা ফুল ওরিজিন্যাল তিনখানা স্ক্রিপ্ট নিয়ে ফ্যা-ফ্যা করে তিন বচ্ছর ধরে সবার কাছে ঘুরে মরছি যার কাছেই যাই, জিজ্ঞেস করে কি কাজ করেছি? আরে, তিন-তিনটে ডিরেক্টর-কে এসিস্ট করেছি, তা হতে পারে সে তিনটে সিনেমার নাম এক ওই সিনেমার ডিরেক্টর-দের ছাড়া কারুর মনে নেই; কিন্তু কাজ তো করেছি!

জিজ্ঞেস করে, নিজের কাজ কিছু আছে কিনা। টিভিতে কিছু করেছি কি? দূর শালা, তাও যদি 'তারা-জলশা'র কোন মহিলা (বা পুরুষ) এমপ্লয়ি-কে পটাতে পারতাম, তাহলেও অন্তত কটা টেলিফিল্ম নামানো যেত। ফিল্ম স্কুল থেকে যারা পাঁচ বছর আগে পাসআউট করেছিল, তাদের অনেকেই এখন কিছু না কিছু করছে। তাদের হয় কোন বান্ধবীর সৎভাই বা কাকুর অবৈধ প্রেমিকার কানেক্‌শন আছে কোন চ্যানেলে। কোন এক রগরগে মেগা চালিয়ে তারা বেশ মেগা-সুখে আছে, হয়ত বা মেগার মেক-আপে মেগা সুন্দরী নায়িকা-দের সাথেই। ধুর শালা, আমার কি?

চাইলে কি মেয়ে পটাতে পারতাম না নাকি? চেহারা-টা তো এক্কেবারে মন্দ ছিল না। ছিল না যেটা, সেটা হল পকেটের পয়সা। সদাগরি আপিসের চাকরিটা দিয়ে ওই ছাতার ফিল্ম-স্কুলটায় গাঁদা-গাঁদা টাকা ঢাললাম। শিখলাম যত না, তার থেকে বাড় খেলাম অনেক বেশি। এমন ভাব দেখাত, যেন পাস করে বেরলেই শালা বাড়ির সামনে প্রোডিউসার আর নায়িকা-দের লাইন পড়ে যাবে। প্রোডিউসার-রা দান করবে মানি, শ্যুটিংয়ের শেষে নায়িকা-গুলি দূর করবে শরীরের গ্লানি

কয়েকজন এঁচড়ে-পাকা তো কিছু না শিখেই ক্যামেরা-ট্যামেরা ভাড়া করে বাপের পয়সা বা নিজেদের অতিরিক্ত পয়সা খরচ করে প্রফেশনাল ক্যামেরা ভাড়া করে কি সব আঁতেলমার্কা শর্ট-ফিল্ম বানানো শুরু করে দিল। হুজুগে পড়ে ওদের সাথে সাথেও ঘুরলাম কিছুদিন। ওঃ সে কি উৎসাহ ওদের। ফিল্ম ফেস্টুতে পাঠাবে, আর ওদের স্থির বিশ্বাস ফেস্টুতে ওদের ছবি এক্কেবারে ফার্স্ট প্রাইজ বাগাবেই। কোন শালা আটকাতে পারবে না! যে ক্যামেরাম্যান-টাকে হায়ার করত ওরা (সে ব্যাটা এখন কোন এক সেন না ঘোষ-এর লেজুড় হয়েছে), সেই সুমন সাঁতরা-ও উৎসাহের সাথে বলে যেত, হ্যাঁ হ্যাঁ দাদা, আপনারা চালিয়ে যান। ওফ্‌ফ্‌ কি শট হচ্ছে এক-একটা। এক্কেবারে 'কুর্‌সাওয়া-কুর্‌সাওয়া' কুরোসাওয়া কোন ছাড়, ওর থেকে ভাল শট আমরা স্কুল পালিয়ে দেখা প্রদীপের সিনেমায় অবধি দেখেছি। কিন্তু এরা তখন সবাই কুর্‌সাওয়া হবার লোভে অন্ধ। সুমন সাঁতরা লোকটা যদিও এখন ওই বিশিষ্ট সেন বা ঘোষের সাথে চুটিয়ে কাজ করছে। ক'দিন আগে বেড়ালের ভাগ্যে একটা জাতীয় পুরস্কারের কথাও কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছিল। 

আমাকেও কয়েকটা শর্ট ফিল্ম বানাতে বলেছিল ওরা। আররে, এটা তো একটা ইনভেস্টমেন্ট অমর্ত্য বলেছিল, লং-টার্মে দেখবি ফাটাফাটি রিটার্ন দেবেই

অমর্ত্য এখন ফিল্ম-এর ভূত মাথা থেকে নামিয়ে স্টক ব্রোকার হয়েছেঃ অবশ্য এটা ওর কথা শুনেই আমার বোঝা উচিত ছিল।

হুজুগে পড়ে প্রায় পনের হাজার টাকা খরচ করে একখানা হ্যান্ডিক্যাম কিনেছিলাম আমি। সেটা ওই ফিল্ম স্কুলে ভর্তি হবার মাস চারেকের মধ্যেই। টাকাটা দিয়েছিল মা। বাবার তো এসবে কোনদিনই সেরকম মত ছিল না। তাও নিজের পয়সাই জলে ফেলছি দেখে কোনদিন খুব বেশি কিছু বলেননি। মাকে যেদিন বলেছিলাম, ক্যামেরা কিনব, সিনেমা করব, মা বেশ ভয়ার্ত চোখেই জিজ্ঞেস করেছিল, সে তো অনেক টাকা, না?

বাবার কাছে গোপন করেই মা'র দুটি সোনার চুড়ি বেচে হ্যান্ডিক্যাম-টা কিনেছিলাম। মা সেদিন হেসে, দুঃখ না করেই বলেছিল, তুই তোর একটা বই-এ দেখাসঃ মা ছেলেকে চুড়ি বিক্রি করে ক্যামেরা কিনে দিচ্ছে। দেখবি, দর্শকের খুব ভাল লাগবেমুখের ওপর না হলেও সেদিন মনে মনে ভেবেছিলাম, ধুর, এ তো একখানা কমার্শিয়াল সিনেমার প্লটলাইন হয়ে গেল। আমি কি থোড়েই কমার্শিয়াল সিনেমা বানাবো নাকি?

যেদিন এক ফিল্ম স্কুলের বন্ধু অমিত-কে বলেছিলাম যে হ্যান্ডিক্যাম নিয়ে শর্ট ফিল্ম করব, সে হেসে বলেছিল, তুই পাগল নাকি? হ্যান্ডিক্যাম-এর লো-রেজলিউশন ছবি প্রোজেক্‌শন করলে তো ছবি ফেটে একাকার হয়ে যাবে। ওতে কোন প্রফেশনাল কাজ হয় নাকি? যদি তোর ফিল্ম-টা কোন ফেস্টুতে সিলেক্ট হয়, তাহলে ওরা কি করে সেটা দেখাবে বলত? অমিত এখন একটা বই করছে, অশান্ত প্রেমজানি না সেটা কোন ফেস্টুতে সিলেক্ট হবে কিনা। আর কিছু না হোক, শালার-টা অন্তত পেশাদার ফিলিম হবে!

এই প্রফেশনাল/পেশাদারিত্বের ব্যাপারটা ভাল করে বুঝতেই আমার সময় লেগে গেল পাক্কা পাঁচ বছর। তাও বোধহয় এখনো পুরোপুরি বুঝিনি। নাহলে নিশ্চয়ই কোন প্রোডিউসারের বউ-কে সপ্তাহে একদিন এন্টারটেন করতে চলে যেতাম। তিনি তার স্বামীকে বলে একটা হিল্লে করাতেন

মাঝে বম্বের একটা লোকের সাথেও আলাপ হয়েছিল। ফিল্ম স্কুল থেকে পাসআউট করেই দিন দশেকের জন্য বম্বে যাই। সদাগরি আপিসের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি তত দিনে। সেখানে হাঁ-ভাতের মতন কদিন এ-স্টুডিও সে-স্টুডিও চক্কর মারার পর লোক-টার সাথে আলাপ হয়। সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম, লেখালেখি করতে ভাল লাগে শুনে শালা একদিন তার বাড়িতে দেখা করতে বললগোরেগাঁওন-তে মাল-টার বিশাল ফ্ল্যাট, একাই থাকে- তবে ঘরের ইতিউতি মহিলাদের পোষাক ছড়ানো, যার মধ্যে অন্তর্বাসের প্রাধান্য লক্ষণীয়। অবশ্য লোকটা মন্দ নয়। মাল খাওয়াল- এক্কেবারে ইম্পোর্টেড। প্রভূত আদর-যত্ন করলআমার স্ক্রিপ্টের কিছু আইডিয়া শুনল, আর বলল বম্বে চলে আসতে পাকাপাকিভাবে। অবশ্যি এর দুদিন পরে কলকাতা থেকে খবর গেল বাবা মারা গেছেন। তারপরে আর বম্বে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ওই মাল-টা এরপরে দুটো বই করে, যার মধ্যে প্রথম বইটার সাথে আমার একটা আইডিয়ার ভীষণ মিল। আর পরেরটা একটা ইংরিজি ছবির ফ্রেম-বাই-ফ্রেম কপি। দুটোই মাঝারি মানের হিট করলেও শালা তার কদিন পরেই তার ১২ বছরের ঝি-কে সিনেমায় নামানোর নামে রেপ করার অভিযোগে শ্বশুরবাড়ি যায়এরপর লোক-টা আর প্রোডিউসার পেয়েছে বলে জানি না

কয়েকটা ওই চোলাইয়ের ঠেকের মতন গজিয়ে ওঠা প্রোডাকশন হাউসেও যাই। ওখানে আবার মাল খাওয়ায় না, সোডা দেয়। মেক-আপ মারা সুন্দরী সুন্দরী রিসেপশনিস্ট-রা বসে বসে টেলিফোনে ইংরিজি ঝাড়ে। এসি ঘরে বসে পয়সা ভিক্ষে চাওয়ার একটা আলাদাই মহিমা আছে। দাদা, ৭৫ লাখ দিনঃ মাইরি বলছি লস খাওয়াব না। এক্কেবারে ছেঁড়া জুতোটার দিব্যি।

কিন্তু ওই ছেঁড়া জুতোকে কেউ কখনো ৭৫ লাখ দেয় নাকি? হলও বা তোমার ওয়ান-লাইনার রিভেটিং, বা সিনপ্সিস, ইন্ট্রিগিংইংরিজি প্রশংসা ভুয়োসি এলেও, ওইসব হাউসে ছেঁড়া জুতোয় গেলে শিকে ছেঁড়া অসম্ভব। তবে ওই সব ছেঁড়া জুতো পর্দায় দেখালে লাখ-টাকা। ড্যানি বয়েলের শ্বশুর এসে হাত ধরে কান, ভেনিস নিয়ে যাবেঃ তাও বিজনেস ক্লাস-এ। যেখানে নাকি এয়ার হোস্টেস-দের পেছনে চিমটি কাটলেও তারা হেসে বলে, উড ইউ লাইক সামথিং, স্যার?

প্লেনে আমিও চড়েছি। দুবার। প্রথম যেবার ওই মনোজ বাড়ুজ্যের সঙ্গে হায়দ্রাবাদ গেলাম একটা ৭০ হাজারের গান শ্যুট করার জন্যে। আর দ্বিতীয়বার গেছিলাম দার্জিলিং, মানে ওই বাগডোগরা। জন্ম-মৃত্যু বই-য়ের একটা গান এবং তিনটে সিন শ্যুট করার ছিল। ডিরেক্টর ছিল শ্যামল দাস। মাল-টা আউটডোরে রোজ রাত্রে সিনেমার নতুন নায়িকা-কে নিয়ে শুতে যেত। আমাকে একদিন নেশার ঘোরে বলেছিলঃ তুইও করবি রে শালা, চিন্তা করছিস কেন? মাল ফেলবিঃ তোকে শালা পুরো পোর্টফোলিও আলবাম বের করে দেবেযাকে ইচ্ছে চুজ্‌ করবি, নো চিন্তা! শালা কি ছবি একেকটা, মাইরি... কি বলব... দেখলেই অর্ধেক কাজ হয়ে যাবে

দার্জিলিং-এই আমার আলাপ হয়েছিল ওর সঙ্গে। মেয়েটার নাম-টা ঠীক মনে পড়ছে না... এখন মোটামুটি নামকরা নায়িকা হয়েছে। আমার হ্যান্ডিক্যামে মেঘে-ঢাকা লাজবতী কাঞ্চনজঙ্ঘা-কে মনের জোরে বে-আব্রু করার ব্যর্থ চেষ্টার প্রতিবাদ করে বলেছিল, ক্যামেরা দিয়ে বুঝি আপনারা আজকাল মেঘ-ও সরিয়ে দিতে পারেন?

অন্য কেউ হলে হয়ত আমি মনে মনে উত্তর দিতাম, ফটোশপে যদি আপনার জামা-কাপড় সরিয়ে দিতে পারি তো এই মেঘ কোন ছাড়?

কিন্তু আমি সে উত্তর চিন্তা করতে পারিনি কেমন একটা বাধো বাধো ঠেকেছিল। ওই অনেকসময় অন্যদের বলা ভাল ছবি দেখতে গেলে যা হয় আরকি! প্রবল ইচ্ছেতে ভাল লাগাবার চেষ্টা করলেও যেমন ভাল লাগানো যায় না, তেমনি তার সম্বন্ধে কোন কুরুচিকর মন্তব্য মাথায় আনতে গিয়েও আমি আনতে পারিনি। অবশ্য এখন পারি। মেয়েটি শ্যামল দাসের বই-তে সফ-অভিনেত্রী হিসেবে থাকলেও ডিরেক্টরের বেডরুমে কিছুদিন পরেই প্রধান জায়গা তৈরি করে নেয়। সেই প্রসঙ্গে ওকে পরে জিজ্ঞেস করাতে খুব সোজা একটা উত্তর দিয়েছিল, তুমি ডিরেক্টর বা প্রোডিউসার হলে তোমার ঘরেও যেতাম

গত বছর যখন মা-র শরীর খারাপ হয়, আমি সুশান্ত রক্ষিতের সঙ্গে দেখা করি। মাল-টার সঙ্গে আমার বসে মাল খাই গোছের বন্ধুত্ব না থাকলেও লোক-টা একসময় আমার একটা ইউনিটের এক্সেকিউটিভ প্রোডিউসার না কি যেন ছিল। ইউনিটেই ওর সাথে পরিচয় হয়। তবে ছবি শেষ হবার পর আর যোগাযোগ করা হয়নি। অবশ্য দেখা দিতেই চিনল, হেসে বসতে বলল তার কসবার ছোট্ট অফিসে, দেওয়ালের রঙ নীল। উড়ো পথে শুনেছিলাম লোকটা একজন ভাল স্ক্রিপ্ট-রাইটার খুঁজছে। তাকে একটা স্ক্রিপ্টের আইডিয়া শোনাতে বেশ উৎসাহও দেখাল। বিকেলে তার বাড়িতে যখন 'ভাল করে কথা বলতে' গেলাম, সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল আমি কত চাই।

মাল-টা আমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে ছবি করবে, আর শালা আমারই নাম দেবে না। বলবে নাকি সে নিজে লিখেছে। যখন মনে মনে ওকে কত রকমের কাঁচা খিস্তি দেওয়া যায় চিন্তা করছি, কেমন একটা মাচা কমার্শিয়াল-মার্কা সিনেমার টার্নিং-পয়েন্টের মতন মা-র মুখটা মনে পড়ে গেল। ব্যাকগ্রাউন্ডে যেন বেজে উঠল সেই আদ্দিকালের বস্তাপচা সানাই-এর করুণ সুর, যেগুলো শুনে স্বপন সাহার সিনেমার দর্শক হল-এ চোখের জল মুছত। কেমন একটা ৯০ দশকের প্রসেনজিৎ চাটুজ্জে-স্টাইলে করুন মুখ করে সেদিন চল্লিশ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। মাকে সুস্থ করে ঘরে আনার পর যদিও তাকে এই গপ্পো-টা শোনানো হয়নি; হলে নির্ঘাত বলত এই নিয়ে ছবি কর। দর্শক খুব পছন্দ করবে আর আমিও মনে মনে মুচকি হেসে বলতাম, ধুর, এ তো পাক্কা কমার্শিয়াল সিনেমার প্লটলাইন হয়ে গেল। আমি কি থোড়েই ওই বস্তাপচা কমার্শিয়াল সিনেমা বানাবো নাকি?

আমি তো বানাবো 'ভাল' সিনেমাযেগুলোতে থাকবে অসাধারণ সব সাবলিমিনাল মেসেজ, যা ইন্টেলেকচুয়াল দর্শক ছাড়া ধরতেই পারবে না। যেগুলোর শ্যুটিং-এর সময়ে ডিরেক্টরকে খুশি করতে তার হোটেল রুমের সামনে নায়িকা-দের লাইন পড়ে যাবে। যেগুলোর ভাবনায় থাকবে ফ্রয়েডিয়ান 'তত্ব' এবং সুরিয়ালিস্টিক 'পাগলামি'র এক অনন্য সঙ্গম, যেখানে ড্রিম এবং রিয়ালিটির বিবাদ ঘটিয়ে সিনেমা-জগতে রেভোলিউশন এনে দেব আমি। যার শ্যুটিং-এর প্রতি রাতে ড্রিঙ্ক করে বাওয়ালি করে পরদিন সকালে বলব, সব মহান ডিরেক্টর ও অভিনেতারাই ড্রিঙ্ক করত। যে ছবির ভাবনা এমন উচ্চ হলেও সঙ্গে এন্টারটেইনমেন্ট-ও থাকবে ষোল আনা। যাতে কমার্শিয়াল এবং ক্রিটিকাল দুধরনের বাহবাই পাওয়া যায়। পাম ডি-ওরের সাথে আনন্দলোক পুরস্কার পেয়ে রেকর্ড করবে আমার সিনেমা। আর কোন নামী ফিল্ম ম্যাগাজিনে আমার ছবি-তে দেখানো নগ্নতার এস্থেটিসিজ্‌ম্‌ নিয়ে ইয়াব্বড় একখানা ক্লাস টেনের ইতিহাসের উত্তর লিখবেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, বা ম্যানোলা ডার্গিস

এক্কেবারে প্রফেশনাল হয়ে যেতে পারলে লাইফে শালা কোন সমস্যা থাকবে না আর। কিন্তু প্রফেশনাল হওয়া-টা যে এত পার্সোনাল একটা ব্যাপার, সেটা বোঝার পর থেকেই ওই শব্দটা কেমন যেন খিস্তির মত শোনায়। প্রফেশনালি রামের পেছনে লক্ষণ-কে মাতৃমাত্রায় খিস্তি মারতে হবে। মাতাল হয়ে বাওয়ালি করতে হবে ওই ছোঁকছোঁকে লোকগুলোর সঙ্গে। কয়েকটা এ-মার্কা জোক্‌স্‌ বলতে পারলে তো কথাই নেই! প্রোডিউসারকে ছলে বলে কৌশলে, বা নিতান্তই মাছ ধরার টোপ গিলিয়ে তাদের সিন্দুক ফাঁক করতে হবে! আঁতেল প্রোডাকশন হাউসে স্যুট-বুট পড়ে, বার্গম্যান, ত্রুফোর দোহাই দিয়ে গোছাতে হবে জাল। পারব... কোনদিন কি পারব না? নিশ্চয়ই পারব। হয়ত একটু সময় লাগবে। কিন্তু বেঁচে থাকতে তো পয়সা চাই... সে শূয়োরের বাচ্চা তো প্রোডিউসারের মতোই বেপাত্তা। 

অলি পাব-এ অবশেষে মাতালরা এক এক করে পাততাড়ি গোটাচ্ছিল। সবাই এখানে কর্মঠ, কাল সকালে 'কাজ' আছে তাদের, সন্ধ্যায় এসেছিলও 'কাজ' সেরে... আমারই 'কাজ' নেই। বিল পেমেন্টের সময় আমার সন্ধ্যার স্পনসর আধো-আধো সুরে বললেন যে তার ঠীক করা সেই 'বেশি-খেতে-চাওয়া' ডিরেক্টর নাকি প্রচন্ড ঝোলাচ্ছে। তার একটা বিশ্বাসী এবং কর্মঠ লোক চাই, আর সেই লোক নাকি আমি। 

হোক প্রোডিউসার বেপাত্তা, না হয় একটা বই ওই ঘোস্ট-ডাইরেক্ট করেই কাটিয়ে দেব। না খেতে পেলে তো এমনিতেই মরে ভূত হয়ে যাব। জ্বলজ্বলে গ্রাফিক্সে নাম না হয় শালা ওই অকর্ম্মা ঢেঁকিটারই গেল। আমার কি? আমার তো পয়সা পাওয়া নিয়ে কথা। গিল্ডের কার্ড-টা যে খেটেখুটে করিয়েছিলাম, সেটারও তো দাম আছে! না হয় এসিস্ট করব আরও দুটো ছবিঃ 'বন্দুক' আর 'প্রিয়া তুমি কে?'। তারপর সবার সাথে মাল-খাওয়া বন্ধু হয়ে যাওয়ার পর সবাই যখন আমায় চিনে যাবে, সবাই যখন যেচে কাজ দেবে... তখন তৈরি করব আমার মনের মতো ছবি। দেখব শালা কোন ব্যাটা প্রাইজ না দিয়ে থাকতে পারে!

শুধু তদ্দিন মা বেঁচে থাকলে হয়। মা মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞেস করে, ওই হ্যান্ডিক্যামে তৈরি করা বই তাকে কবে দেখাবো... কিন্তু ওই সিনেমা তো আবার শালা প্রফেশনাল হবে না!

-----------------------------------------------------------------------------------------------

(বলাই বাহুল্য, গল্পের সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক, যদিও তারা বেশ কিছু সত্যিকার নাম-না-জানা চরিত্র থেকে অনুপ্রানিত।)



2 comments:

ali-F said...

adbhut r ashombhob sundor.really.amak khubi touch koreche.

Aparajita said...

Khub khub valo... I like "professional hoa ta personal ekta byapar" line ta...especially, it says lots of things... tumi seriously lekho Jagannath, not for film only but also for the sake of Sahityo.. Tomar hobe. Tumi ei lekhata nie kono Sahityo patrikae approach korte paro.."Anandolok"... Give a try.. All the Best.